প্রচ্ছদ / মনের-দুয়ার / বিস্তারিত
 

For Advertisement

600 X 120

চাকরিতে পুরুষদের কাছে শরীর সমর্পণ করতে হয়

১৩ এপ্রিল ২০১৮, ৪:২৭:৪৯

ঢাকা, ১৩ এপ্রিলকারেন্ট নিউজ বিডি : ‘কাস্টিং কাউচ’ বলে ইংরেজিতে একটি কথা আছে, যেটির মানে তোমাকে আমি সুযোগ দেবো, কিন্তু আমার সঙ্গে তোমার শুতে হবে। সিনেমা জগত থেকেই এসেছে ‘কাস্টিং কাউচ’ প্রবাদটি। শুধু সিনেমা জগতে নয়, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সর্বত্র এই কাস্টিং কাউচ চলছে। বিবাহিত-অবিবাহিত যুবক-বৃদ্ধ-পুরুষ-কর্তারা চাকরিপ্রার্থী মেয়েদের সঙ্গে প্রতারণা করবে, এ-ই যেন স্বাভাবিক। মেয়েদের শুধু চাকরি পেতে হলেই নয়, চাকরি বহাল রাখতে হলেও পুরুষ-কর্তাদের কাছে শরীর সমর্পণ করতে হয়। পুরুষ-কর্তার অফিসঘরে বিছানা নেই, কিন্তু কাউচ বা সোফা তো থাকেই আরাম করার জন্য, সেই সোফায় শুয়ে-বসেই চাকরিপ্রার্থী মেয়েদের শরীর ভোগ করে পুরুষ-কর্তারা।

তেলুগু সিনেমার উঠতি অভিনেত্রী শ্রী রেড্ডি নগ্ন প্রতিবাদ করেছেন তেলুগু সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির বড় বড় পরিচালক-প্রযোজকদের কাস্টিং কাউচের বিরুদ্ধে। তিনি ‘মুভি আর্টিস্ট এসোসিয়েশন’-এর বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেছেন। কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেছেন শ্রী রেড্ডি, তারপরও তাঁকে এসোসিয়েশনের সদস্যপদ দেওয়া হয়নি। শ্রী রেড্ডি মুভি আর্টিস্ট এসোসিয়েশনের অফিসের সামনের রাস্তায় ওই ‘কাণ্ড’টি করেছেন। নগ্ন হওয়ার ‘কাণ্ড’টি। তিনি সম্পূর্ণ নগ্ন হননি, জামা খুলেই দুহাতে আড়াল করেছেন স্তন।

কিন্তু এটুকুর জন্য যা হওয়ার হয়ে গেছে। মুভি আর্টিস্ট এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট শিবাজি রাজ বলে দিয়েছেন শ্রী রেড্ডি যেহেতু প্রতিবাদ করেছেন, কোনও দিন তাঁকে আর সদস্যপদ দেওয়া হবে না। হুমকি দিয়েছেন, শ্রী রেড্ডির সঙ্গে কোনও শিল্পী যেন অভিনয় না করেন, করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ অবস্থায় তো নিশ্চিতই যে শ্রী রেড্ডিকে কোনও পরিচালক বা প্রযোজক কোনও ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ দেবেন না। ওদিকে শ্রী রেড্ডির বাড়িওয়ালাও বলে দিয়েছেন বাড়ি ছাড়তে। কোথায় তিনি বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়তে চেয়েছিলেন, এখন নিজেই আরও বেশি বৈষম্যের শিকার হলেন। নগ্ন হয়েছিলেন বলে মানুষের বড় রাগ। তার ওপর ধনী এবং প্রভাবশালী পুরুষদের বিরুদ্ধে তিনি মুখ খুলেছেন! তাঁকে অত সহজে বাঁচতে কে দেবে! নগ্ন প্রতিবাদ নতুন কিছু নয়। পৃথিবীতে বহুকাল মানুষ এভাবে প্রতিবাদ করেছে। নগ্ন প্রতিবাদ করলে মানসিক এবং শারীরিক ঝুঁকি নেওয়া হয় বটে, কিন্তু এটি একরকম শক্তিও দেয়; হাতে কোনও অস্ত্র নেই, তারপরও নিজেকে মনে হয় শক্তিমান।

আটের দশকের বাংলাদেশে নূর হোসেন নামের এক গরিব অটো ড্রাইভার খালি গায়ে, বুকে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’, পিঠে ‘স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক’ লিখে তখনকার স্বৈরাচারী সরকার এরশাদের বিরুদ্ধে মিছিল করেছিলেন। নূর হোসেনের বুকে গুলি করেছিল পুলিশ, রক্তাক্ত নূর হোসেন লুটিয়ে পড়েছিলেন। নূর হোসেনের মৃত্যু বাংলাদেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সেই থেকে নূর হোসেন বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রতীক, মুক্তির প্রতীক। নূর হোসেনকে নিয়ে কত নাটক সিনেমা গান কবিতা লেখা হয়েছে। মিছিলে তো কত তরুণ গুলি খেয়ে মারা যায়। কিন্তু বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের শহিদদের পর নূর হোসেন ছাড়া আর কারো মৃত্যুই এত স্তব্ধ করেনি শোকে।

নূর হোসেনের নগ্ন প্রতিবাদ মানুষের দৃষ্টি কেড়েছিল। নগ্ন প্রতিবাদ কিন্তু বস্ত্রহীনতা নয়, নগ্ন প্রতিবাদ সকলের সামনে বস্ত্র খুলে ফেলা। বস্ত্র খুলে নিরস্ত্র হওয়া। নিরস্ত্র হলে সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অনেক মূল্যবান হয়ে ওঠে। সশস্ত্র আর নিরস্ত্রের মধ্যে যে বৈষম্য, তা বড় প্রকট হয়ে ওঠে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে নগ্ন প্রতিবাদ তাই অন্য সব প্রতিবাদের তুলনায় অর্থবহ হয়ে ওঠে। কারণ তখন কে অত্যাচারী আর কে অত্যাচারিত তা খুব প্রকট হয়ে চোখে পড়ে। কামানের সামনে খোলা বুক পেতে দেওয়ার মতো বলিষ্ঠ দৃশ্য আর কী হতে পারে?

মনে আছে ১৯৮৯ সালে চীনের কামানের সামনে দাঁড়ানো সেই যুবককে? বেইজিং-এর তিয়ানানমান স্কোয়ারে আগের রাতে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলনরত প্রায় ১০ হাজার ছাত্রছাত্রীকে পিষে ফেলার পর সকালে আবার যখন ওই স্কোয়ারে কামান ঢুকছিল, একটি নিরস্ত্র যুবক কামানকে আর এক পা এগোতে নিজের শরীর দিয়ে বাধা দিয়েছিল। শরীরটিকে কি তখন কামানের চেয়ে শক্তিশালী মনে হয়নি? নিশ্চয়ই হয়েছিল। ওই শরীরের পক্ষে তখন বিশ্বের মানুষ দাঁড়িয়েছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে মনে আছে ১৯৬৯ সালে বিখ্যাত বিটলস গানের দলের শিল্পী জন লেনন তাঁর স্ত্রী ইয়োকো ওনোকে নিয়ে হোটেলের ঘরে নগ্ন প্রতিবাদ করেছিলেন? যুদ্ধ নয়, শান্তি চেয়েছিলেন। তাঁর প্রতিবাদের নাম দিয়েছিলেন ‘বিছানা-শান্তি’। বলেছিলেন ভালোবেসে যৌন সঙ্গম করো, যুদ্ধ করো না। মৃত্যু আর হত্যার দিক থেকে যৌনতার দিকে ফেরাতে চেয়েছিলেন মানুষকে।

নগ্ন প্রতিবাদ মানুষের এবং মিডিয়ার দৃষ্টি কাড়ে। মানুষের সহানুভূতি কাড়ে। কারণ নগ্ন যে হয়, সে প্রতিনিধিত্ব করে অত্যাচারিতের। মণিপুরের মেয়েদের আর্মিরা ধর্ষণ করতো। ধর্ষণে আর হত্যায় অতিষ্ঠ হয়ে ২০০৪ সালে বয়স্ক মণিপুরি মহিলারা উলঙ্গ হয়ে আসাম রাইফেলসের কাংলা ফোর্টের সামনে গিয়েছিলেন। তাঁদের ব্যানারে লেখা ছিল— ‘এসো, ভারতের আর্মি, আমাদের ধর্ষণ করো।’ ধর্ষণবিরোধী কোনও আন্দোলনই এর আগে চেতনার পিঠে এমন জোরে চাবুক মারেনি।

বিশ্ব জোড়া নগ্ন প্রতিবাদ হয়েছে বিভিন্ন বৈষম্যের বিরুদ্ধে। গত বছর আর্জেন্টিনার ১০০ মেয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে প্রতিবাদ করেছে প্লাজা দ্য মায়োর আদালতের সামনে। মেয়েদের ওপর যত রকম অন্যায় অত্যাচার নির্যাতন হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ। প্রতিদিন একটি করে নারী-হত্যার প্রতিবাদ। সম্পূর্ণ নগ্ন মেয়েরা ফুটপাতে শুয়ে পড়েছে, এক শরীরের ওপর আরেক শরীর পেঁচিয়ে রয়েছে। না, ওই দৃশ্য দেখে কারো যৌন উত্তেজনা হবে না, বরং নারীর ওপর হওয়া অত্যাচারের বিরুদ্ধে চোয়াল শক্ত হবে। অন্তত হওয়ারই কথা। আর্জেন্টিনায় কয়েক বছর আগেও মেয়েরা দিব্যি গায়ের সব কাপড় খুলে বসে ছিল সংসদ ভবনের সামনে, মেয়েদের যে যৌন বস্তু হিসেবে দেখা হয়, তার বিরুদ্ধে।

পশু অধিকারের জন্য লড়াই করা ‘পেটা’র মেয়েরাও নগ্ন প্রতিবাদ করেছে ফ্যাশান ইন্ডাস্ট্রির বিরুদ্ধে, যেহেতু তারা পশুর লোম দিয়ে পোশাক তৈরি করে। ‘পশুর লোম পরার চেয়ে উলঙ্গ থাকাই ভালো’, এই বলে মুখে পশুর মুখোশ পরে মেয়ে-পুরুষ সবাই শুয়ে পড়েছে রাস্তায়।

সারা পৃথিবীতে ফেমেন নামের এক নারীবাদী সংগঠন নগ্ন প্রতিবাদ করে চলেছে অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে। তাদের প্রতিবাদ ধর্ম, পুরুষতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, দুর্নীতি, ধর্ষণ, নারী হত্যার বিরুদ্ধে। যে কোনও জায়গায় ফেমেনের মেয়েরা বুকে পিঠে প্রতিবাদের বাণী লিখে দাঁড়িয়ে যায়। এই সেদিনও বিল কসবিকে যখন আদালতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, ফেমেনের মেয়েরা বস্ত্র খুলে দাঁড়িয়ে পড়েছে, সারা গায়ে স্লোগান লেখা, মেয়েদের জীবনের গুরুত্ব আছে, ‘উইমেন’স লাইভস ম্যাটার’। বিল কসবিরা তো মেয়েদের যৌন বস্তু হিসেবেই মনে করে আসছে।

নগ্ন প্রতিবাদের সময় মেয়েরা যখন শরীরের ওপরের অংশের কাপড় খুলে ফেলে, সবার চোখ যায় মেয়েদের স্তনে। স্তন আছে বলেই ফেমেনের মেয়েদের চ্যাংদোলা করে পুলিশ সরিয়ে নেয়। প্রতিবাদরত পুরুষকে কিন্তু পুলিশ চ্যাংদোলা করে সরায় না। স্তন প্রাকৃতিক জিনিস অথচ একে কী ভীষণ দৃষ্টিকটু ভাবা হয়! আসলে এটি যেমন প্রাকৃতিক তেমন বলিষ্ঠ। অস্ত্রশস্ত্র অথবা ক্ষমতার বিরুদ্ধে সেই সম্পদ নিয়ে প্রতিবাদ করতে হয়, যে সম্পদ প্রকৃতি তাদের দিয়েছে। নগ্নতা, কেউ মানুক আর না মানুক, প্রতিরোধের প্রতীক।

শ্রী রেড্ডির প্রতিবাদ তীব্র হয়ে উঠেছে যখন তিনি এক এক করে পরনের কাপড় খুলে ফেলেছেন। শ্রী রেড্ডি যে কথাগুলো বলতে চেয়েছেন, সে কথাগুলো আগে কেউ শোনেনি। কাপড় খুলেছে বলেই শুনেছে। শরীর দিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়। রেড্ডিকে নগ্ন প্রতিবাদ থেকে পুলিশ উঠিয়ে নিয়ে গেছে দ্রুত। রেড্ডির প্রতিবাদ প্রভাবশালী আর প্রতাপশালীরা কানে নেয়নি, মনেও নেয়নি। পুরুষতন্ত্রের গায়েও কোনও আঁচড় লাগেনি সম্ভবত পুরুষতন্ত্র এই অঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী বলেই। রেড্ডির মতো আরও মেয়ে যদি প্রতিবাদ করতো, তাহলে হয়তো তারা পারতো তরঙ্গ তৈরি করতে। দিল্লিতে নির্ভয়াকে ধর্ষণের প্রতিবাদে যেভাবে মানুষ মুখর হয়েছিল।

রেড্ডি জানিয়েছেন তিনি কাস্টিং কাউচের শিকার হয়েছেন। কোনও বিখ্যাত পরিচালক আর প্রযোজক তাঁকে যৌনতার কাজে ব্যবহার করেছেন, কারা তাঁকে সুযোগ দেবেন এই লোভ দেখিয়ে শুতে চেয়েছেন— সবার নামই বলে দিয়েছেন রেড্ডি। ঠিক এভাবে বলিউডে এবং অন্যান্য ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যদি মুখোশ খুলে পড়তে থাকে সেইসব ধর্ষকের যাঁরা দেবতার ভাব দেখিয়ে মানুষের শ্রদ্ধা ভালোবাসা কাড়েন, আর গোপনে গোপনে ইন্ডাস্ট্রির অসহায় মেয়েদের ধর্ষণ করেন।

মেয়েদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও মেয়েদের যৌনস্বার্থে ব্যবহার করেন পুরুষ-কর্তারা। মেয়েদের যৌন বস্তু হিসেবেই দেখেন পুরুষেরা। শিল্পী সাহিত্যিকরা, সকলে জানে যে, অন্য যে কারো চেয়ে বেশি প্রগতিশীল, নারী পুরুষের সমতায় অন্যদের চেয়ে তাঁরাই বেশি বিশ্বাস করেন। অথচ তাঁরা যে কোনও অশিক্ষিত অসংবেদনশীল অমানবিক পুরুষের মতো ধর্ষক। মেয়েদের অসহায় পেয়ে তাঁরাও মেয়েদের যৌনদাসী বানাতে বাধ্য করেন।

হলিউডে যৌন প্রতারকদের মুখোশ ধীরে ধীরে খুলে পড়ছে। বলিউড, টলিউড, কলিউড, ঢালিউড— সব উডের যৌন প্রতারকদের মুখোশ খুলে পড়লেই শুধু হবে না, হলিউডের বিখ্যাত সেইসব প্রভাবশালীর যেমন পায়ের তলার মাটি সরে গেছে, এখানেও তাই হওয়া চাই। মেয়েদের শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে অপমান অপদস্থ করেও উচ্চপদে আসীন যেন কোনও পুরুষ-কর্তাই না থাকতে পারে। তাঁদের সুনাম যেন সুনামির আঘাতের মতো আঘাত খেয়ে নিরুদ্দেশে চলে যায়।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।
সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন

 

For Advertisement

600 X 120

কারেন্ট নিউজ বিডি'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। 

পাঠকের মতামত: